নিতু আজ লাল রঙের ঢাকায় জামদানি পড়েছে। শাড়ীর আচল আর পারে গোল্ডেন কালারের সুতা দিয়ে কাজ করা। পুরো শাড়ীতে একটা রাজকীয় ভাব আছে। বাংলা করে শাড়ী পড়ায় আরো বেশী রাজকীয় লাগছে নিতুকে। গলায় ভারী ডিজাইনের কন্ঠহার,শুধু কন্ঠহার নয় একটা বেশ বড় আর ভারী ডিজাইনের সীতা হারও পড়েছে। কানে ঝুমকো, এক হাতে বেশ মোটা দুটো রুলি বালা, দুই বালার মাঝে গোল্ডেন কালারের ডজন খানেক চিকন চিকন চুড়ি। অন্য হাতে বেশ ভারী ডিজাইনের চুড়। কোমড়ে একটা সোনার বিছা। নিতু এমনিতে মেকআপ,সাজগোজ একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তুু তবুও আজ মুখে বেশ ভারী মেকআপ করেছে। মেট এর লাল লিপস্টিকে আজ নিতুর ঠোট দুটো আরো আকর্ষনীয় লাগছে। চুলগুলো একপাশে কার্ল করেছে, মাঝখানে সিথি সেই সিথিতে ভারী ডিজাইনের টিকলি পড়েছে। চুলের অন্য পাশে জড়িয়েছে বেলীফুলের মালা।শাড়ীর আচল কিছুটা মাথার উপরে ক্লিপ দিয়ে আটকানো। নিতুর মেহেন্দি রাঙা হাতদুটো বেশ লাগছে। সব মিলিয়ে নিতু আজ রাজকীয় বউ। রাজকীয় বউ তো আজ হতেই হতো। নিতুর একমাত্র ননদের বিয়ে আজ। শাশুড়ির কড়া নির্দেশ সুন্দর করে সাজতে হবে। দেখে যেন মনে হয় পুরান ঢাকার খানদানি বউ।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না নিতু। নীতুরা ঢাকাইয়া না, কিন্তুু নিতুর বয়স যখন দশ বছর তখন থেকেই নিতুর বাবার চাকরী সূত্রে ওরা ঢাকাতে আসে। খুব শখ করে নীতুর বাবা নিতুকে পুরান ঢাকায় বিয়ে দিয়েছে। ঢাকা শহরে পুরান ঢাকার মানুষের মত এত অতিথিপরায়ন আর মিশুক কেউ নেই। নিতুর বাবা পুরান ঢাকার বউদের এই রাজকীয় সাজ খুব পছন্দ করতো। তাই আয়নাতে নিজেকে দেখেই নিতুর বাবার কথা মনে পড়ে গেল।
হঠাৎ একটা চিৎকারে ভাবনায় ছেদ পড়লো নিতুর। কন্ঠ শুনেই বুঝলো ওর শাশুড়ী ডাকছে। একমাত্র ননদের বিয়ে আজ। অনেক দ্বায়ীত্ব নিতুর। শাশুড়ীর ঢাকে হুড়মুড় করে যেতে লেগে শাড়ীতে বেধে ধ্বাক্কা খেল সাগরের সাথে। আসলে শাড়ী পড়ায় খুব বেশী অভ্যাস্ত না নিতু। তাই এমনটা হলো। নিতুকে দেখেই রিতীমত থ হয়ে গেছে সাগর। এ কি রুপ দেখছে ও!
নিতু আর সাগরের বিয়েটা হয়েছে আজ থেকে প্রায় ছয় মাস আগে। পারিবারিক ভাবেই ওদের বিয়েটা হয়েছে। তাই দুজন দুইজনকে বুঝে উঠার সময়টাও পায়নি। সাগর কে বিয়ে করায় প্রথম থেকেই নিতুর আপত্তি ছিল। কারন পুরান ঢাকার ছেলেদের সম্পর্কে ওর ধারনাটা পুরোপুরি নেগেটিভ। পুরান ঢাকার ছেলেরা কথায় কথায় স্ল্যাং ব্যাবহার করে, একটু পেটুক কোয়ালিটির হয়, সবসময় জমিদারি ভাব দেখায় আর মানুষের সাথে ঝামেলা করে। বিয়েতে আপত্তি থাকলেও অন্য কোন উপায় ছিল না বিয়েটা বন্ধ করার। কারন নিতুর কোন রিলেশন ও ছিল না যে তার কথা সবাই কে বলবে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়েই বিয়ে করেছিল সাগরকে। কিন্তুু বিয়ের পর নীতুর সব ধারনা পাল্টে গেছে।
- কি হলো ছাড়ো।
নিতুর কথায় সাগরের চেতনা ফিরলো। কি অপরুপ লাগছে মেয়েটাকে।
- ম্যাডাম এতো সাজগোজ কার জন্য শুনি?
- এসে বলছি,মা ডাকছে।
এই বলে এক দৌড়ে পালিয়ে গেল নিতু। নিতু প্রথম থেকেই খুব লাজুক প্রকৃিতির মেয়ে। সাগর তখনও নিতুর চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে। নিতুর আলতা রাঙা পায়ের নুপুরের একেকটা ঝঙ্কার সাগরে বুকে এসে লাগছে।
ব্যাস্ত বিয়ে বাড়ীতে নিতুও বিভিন্ন কাজে ব্যাস্ত। সাগর দূর থেকে নিতুকে দেখছে। নিজের বউকে লুকিয়ে দেখার মজায় আলাদা। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন কানটা চেপে ধরল। পেছনে তাকাতেই দেখলো মোহনা। মোহনায় সাগরের একমাত্র বোন। ওর বিয়ের জন্য এত আয়োজন।
- আজ না তোর বোনের বিয়ে, এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে ভাবীকে দেখলে হবে?
- কে বলছে আমি তোর ভাবীকে দেখছি, এই তো কাজ করছি।
- ও হো, আমি কিছুই বুঝি না মনে হচ্ছে! মায়ের কাছে থেকে শুনলাম সকাল থেকে তুই কিছুই খাস নি। একটু পড়েই সন্ধ্যা হবে তার পর ছুটবি কমিউনিটি সেন্টারে। রাতে খেতে তো অনেক দেরী হবে। চল এখন খাবি।
- আমার খিদা নাই। আইছে বুড়িমা। যা তোর বরের খোজ নে। আমারে ছ্যাইড়া দে।
- সকাল থেকে আমিও কিছু খায়নি ভাইয়া।
মোহনার চোখ দুটোতে জল ভরে উঠেছে।
- কেন?
- তোকে ছাড়া আমি খেয়েছি কখনও? খুব খিদা লাগছে। চল আমার সাথে খাবি চল।
সাগর আর কিছুই বলতে পারলো না।নিশ্চুপ কষ্টটা লুকিয়ে মোহনার সাথে চলে গেল।
,
রাত ৮ বেজে গেছে। মোটামুটি বাসার সবাই চলে গেছে কমিউনিটি সেন্টারে। শুধু নিতুই যায়নি। যাবে কিভাবে! সেই কখন থেকে সাগরকে ফোন করছে ও। ছেলেটা ফোনও ধরছে না,এমনকি মেসেজের রিপলেও করছে না। কমিউনিটিসেন্টারেও যায়নি। আজব তো, কোথায় গেল ও। এসব ভাবতে ভাবতে ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে শাড়ী ঠিক করছিল নিতু। হঠাৎ চোখ পড়লো ড্রেসিংটেবিল এর উপর রাখা চিরিকুটে। হাতে নিতেই দেখলে লেখা আছে,
"" এই যে পুরান ঢাকার খানদানি বউ একটু ছাদে আসেন, কথা আছে "
চিরিকুট হাতে পাওয়ার পর একছুটে ছাদের গেল নিতু। গিয়ে দেখল সাগর ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। নিতু কাছে গিয়েই বললো,
- কি হয়েছে, সবাই চলে গেছে। কখন থেকে তোমাকে ফোন করছি ধরনা কেন?
- আজ থেকে মোহনা পর হয়ে গেল তাই না নিতু?
- কি বলছো এসব, পর হবে কেন। বিয়ে হলেই বুঝি পর হয়ে যায়।
- আমার সেই ছোট্ট বোনটা কবে যে বড় হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না।
- মেয়েদের জীবনটা এমনই বুঝলে, এই আমাকে দেখ, জীবনে কখনও ভাবিনী এমন রাজকীয় সাজে আমাকে ঘুরতে হবে! কত সুন্দর করে নিজেকে তেমাদের পরিবেশে মানিয়ে নিয়েছি।
- তেমাকে বেশ লাগছে আজ। আমি ঐ রুপে পুড়ে যাচ্ছি।
- হয়ছে স্যার,আর পুড়তে হবে না এখন চলো।
এই বলে নিতু পা বাড়াতে পেছন থেকে হ্যাচকা টানে নীতুকে জড়িয়ে ধরলো সাগর। নিতু মুখে ছাড়ো ছাড়ো বললেও মনে মনে বেশ খুশি। খুশি হবে না কেন, সব মেয়েই তো চাই স্বামীর এমন আদোর,ভালোবাসা।
- ঐ যে দেখছো আকাশের সবচেয়ে উজ্জল তারা ওটা তুমি। আর তার সবচেয়ে কাছের তারাটা আমি। আর বাকী সব ছোট ছোট তারাগুলো আমাদের ছেলে মেয়ে। চল আজ সারা রাত আমরা গুনবো আমাদের মোট কতগুলো ছেলে মেয়ে!
- ওরে আমার রোমান্টিক বর রে! আজ তোমার ছোট বোনের বিয়ে আর তুমি আসছো ছাদে প্রেম করতে।
- নিতু আজ তোমার থেকে কিছু চাইবো, দিবে?
- কি?
- আমার এই রাজকীয় বউ এর কোলে ছোট্ট রাজকন্যা চাই। ঠিক তোমার মত।
- আমি কিরে দিব! দিবে তো তুমি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন